বদলি হজ কি এবং কেন আদায় করা প্রয়োজন ?

বদলি হজ

হজ্ব একটি কঠিন ইবাদত। একে জিহাদের সাথেও তুলনা করা হয়েছে। এ কারণে এতে ছওয়াবও বেশি এবং উপকারিতাও অনেক। বিধানগত দিক থেকে হজ্ব আদায় করা সহজ, কিন্তু যেহেতু এর জন্য সফর করতে হয় এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জমায়েত বিশেষ বিশেষ স্থানে একসাথে এই ইবাদত আদায় করে থাকে তাই তা কঠিন ও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে অনেক মানুষের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে তা আদায়ের সামর্থ্য থাকে না। এ ধরনের মাজুরদের প্রতি মেহেরবানী করে আল্লাহ তাআলা বদলী হজ্বের অবকাশ দান করেছেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, বিদায় হজ্বে খাছআম গোত্রের একজন নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বাবার উপর হজ্ব ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি এত বৃদ্ধ যে, বাহনের উপর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেন না। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারব?’ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ। (তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারবে)।’-সহীহ বুখারী ১/২০৫; সহীহ মুসলিম ১/৪৩১

হযরত আলী রা. অতিশয় বৃদ্ধ লোক সম্পর্কে বলেছেন-

يُجَهِّزُ رَجُلاً بَنَفَقَتِهِ فَيَحُجُّ عَنْهُ

সে তার পক্ষ থেকে হজ্ব করাবে এবং এর খরচ বহন করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/৫৯৯

দেখুন : আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬১; মানাসিক, মোল্লা আলী কারী ৪৩৪

যেসব কারণে নিজে হজ্ব আদায়ে অক্ষম গণ্য হয়

১. ফরয হওয়ার পর আদায়ের সুযোগ পাওয়ার আগেই মৃত্যু এসে গেলে। এ ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি থেকে হজ্ব রহিত হয়ে যায়। সুতরাং তার জন্য মৃত্যুর সময় হজ্বের অসিয়ত করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

২. কেউ জোরপূর্বক আটকে রাখলে বা হজ্বের সফরে যেতে না দিলে।

৩. এমন কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে, যা থেকে সুস্থতা লাভের আশা নেই। যেমন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলে, অন্ধ বা খোড়া হয়ে গেলে কিংবা বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা এত বেশি হলে যে, নিজে বাহনের উপর আরোহন করতে

পারে না।

৪. রাস্তা অনিরাপদ হলে। অর্থাৎ সফর করতে গেলে যদি জান-মালের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

৫. নারী তার হজ্বের সফরে স্বামী বা উপযুক্ত মাহরাম পুরুষ সঙ্গী না পেলে।

এসব কারণে ঐ ব্যক্তিকে মাজুর বা অক্ষম গণ্য করা হবে এবং সে নিজের পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করাতে পারবে।-মানাসিক, মোল্লা আলী কারী ৪৩৫; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২১

হজ্ব আদায়ে অক্ষমতার ওজর দুই ধরনের হতে পারে : ক) যা দূর হওয়ার সম্ভাবনা আছে। খ) স্বাভাবিক অবস্থায় যা দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

যে ওজর দূর হওয়ার সম্ভাবনা আছে যেমন অসুস্থ, পাগল বা কারাবন্দি হওয়া; স্বামী বা মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বদলী হজ্ব জায়েয হওয়ার জন্য শর্ত হল, ওজরটি মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী হতে হবে। সুতরাং এ ধরনের ওজরে বদলী হজ্ব করানোর পর যদি ঐ ওজর অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয় তাহলে তার ফরয হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে বদলী হজ্ব করানোর পর মৃত্যুর আগে ওজর দূর হয়ে গেলে ঐ হজ্বটি নফল হয়ে যাবে এবং তাকে নিজের ফরয হজ্ব আদায় করতে হবে।

আর দ্বিতীয় প্রকারের ওজর, অর্থাৎ যা দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই, যেমন অন্ধ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া। এক্ষেত্রে বদলী হজ্ব জায়েয হওয়ার জন্য তা মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া শর্ত নয়। অর্থাৎ এ জাতীয় ওজরের কারণে অন্যের দ্বারা বদলী হজ্ব করানোর পর আল্লাহ তাআলার খাছ কুদরতে যদি দৃষ্টিশক্তি বা চলৎশক্তি ফিরে পায় তাহলে তাকে পুনরায় ফরয হজ্ব করতে হবে না। পূর্বের বদলী হজ্বের মাধ্যমে তার ফরয হজ্ব আদায় হয়ে গেছে।-আলবাহরুর রায়েক ৩/৬১; রদ্দুল মুহতার ২/৫৯৯; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২১; যুবদাতুল মানাসিক ৪৪৮

মাহরাম পুরুষ ছাড়া মহিলাদের হজ্বের সফরে যাওয়া জায়েয নয়। অন্য মহিলাদের সঙ্গী হয়েও হজ্বে যাওয়া নাজায়েয। তারা স্বামী বা মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। যদি মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা না হয় আর এভাবেই এমন বার্ধক্য এসে যায় যে, নিজে হজ্ব করার শক্তি না থাকে তাহলে ঐ সময় কাউকে পাঠিয়ে বদলী হজ্ব করিয়ে নিবে বা বদলী হজ্বের অসিয়ত করে যাবে।

কোনো ব্যক্তির উপর হজ্ব ফরয ছিল, কিন্তু সে তা আদায় করেনি এবং তার পক্ষ থেকে আদায়ের অসিয়তও করেনি। এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। তার পক্ষ থেকে ওয়ারিশদের বদলী হজ্ব করা বা করানো জরুরি নয়। তবে কোনো ওয়ারিশ বা অন্য কেউ স্বেচ্ছায় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করলে এর দ্বারা ঐ মৃত ব্যক্তির ফরয হজ্ব আদায় হয়ে যাওয়ার আশা করা যায়।

বদলী হজ্ব করার জন্য কোনো প্রকার বিনিময় বা পারিশ্রমিক লেনদেন করা যাবে না। কেননা হজ্ব একটি ইবাদত। আর ইবাদতের বিনিময় নেওয়া ও দেওয়া দুটোই নাজায়েয। তাই বদলী হজ্বের জন্য পারিশ্রমিক দেওয়া হলে প্রদানকারী ও গ্রহণকারী দুজনই গুনাহগার হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রেরণকারীর হজ্ব আদায় হয়ে যাবে বটে তবে হজ্ব আদায়কারী পারিশ্রমিকরূপে যা কিছু নিয়েছে তা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। সে শুধু হজ্বের খরচ নিতে পারবে। অতিরিক্ত কিছুই নিতে পারবে না।-আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬৯; মানাসিক ৪৩৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬০০

বদলী হজ্ব এমন লোককে দিয়ে করানো উচিত, যিনি নিজের ফরয হজ্ব আদায় করেছেন। যে ব্যক্তি নিজের হজ্ব আদায় করেনি সে যদি এমন হয় যে, তার উপর হজ্ব ফরয নয় তাহলে তাকে দিয়েও বদলী করানো জায়েয আছে। তবে তা মাকরূহ তানযীহি। আর যদি তার উপর হজ্ব ফরয হয়ে থাকে, কিন্তু সে এখনও তা আদায় করেনি তাহলে তার জন্য বদলী হজ্ব করা মাকরূহ তাহরীমী তথা নাজায়েয। আর বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার, যার মাধ্যমে বদলী হজ্ব করানো হচ্ছে তিনি হজ্বের মাসায়েল সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত কি নাি ।

এই ব্যাপারে যে কোন সহযোগিতা নিতেপারেন আমাদের স্বনামধন্য সরকার অনুমোদিত হজ প্রতিষ্ঠান জিলহজ ট্রাভেলস্ থেকে ।

আবুল কালাম বরকতি