আজ আমি একটা কাজে টরন্টোর ড্যানফোর্থ এ্যান্ড ভিক্টোরিয়া পার্কে গিয়েছিলাম। বাঙালি দোকানগুলোর সামনে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে
কানাডা কি ভিজিট ভিসার
পরিচয় হয় এক অল্প বয়স্ক বাঙালি ভাইয়ের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে উনি বলছিলেন, এখানে কোনো চাকরি নেই, কাজ জোটানো কঠিন ইত্যাদি। আমি ওনার কাছে জানতে চাইলাম আপনি কতোদিন ধরে আছেন টরন্টোতে? তিনি বললেন, ‘আপা, গতমাসে এসেছি এক মাসও এখনো হয় নি। আমি বললাম কী ভিসায় এসেছেন? উনি বললেন, ভিজিট ভিসায়। কিন্তু আমি asylum এর জন্য আবেদন করেছি।
আমি হিসেব মেলাতে পারছিলাম না বিধায় আরো কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম। আমি আরেকটু খটকা খেলাম। বললাম wait, আপনি এসেছেন ভিজিট ভিসায়, এসেই করেছেন এ্যাসাইলাম সিক কেমনে কি একটু বলুন তো। প্রথমত আপনি ভিজিট ভিসাটাই পেলেন কীভাবে? উনি বললেন, আপারে, সবকিছুই সিস্টেমে হয়। আমার চোখ কপালে উঠল। বললাম সেই সিস্টেমটা কী বলুন শুনি। তিনি বললেন ‘দালাল করে দিয়েছে ভিজিট ভিসা ভারত থেকে।’ আরো বললেন ‘আমি অন্য একটা দেশে ছিলাম। মিডেল ইস্টে। সেখান থেকে আমি দেশে ফিরে যাই। তারপর দালালের মাধ্যমে ভিজিট ভিসা করিয়ে টরন্টোতে এসেছি গতমাসে। এখানে এসে একজন বাঙালি যিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন তার মাধ্যমে asylum এর আবেদন করেছি। দুই বছরের মতো লাগবে PR পেতে।” উনি বলে গেলেন এসব আর আমি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। তিনি জানালেন, দেশে তার বউ, ছেলেমেয়ে আছে। আর উনি প্রথমে ছিলেন এক দেশে, এখন তো আছেন টরন্টোতে asylum seek করে। আমি বললাম তো এখন আপনি কীভাবে চলছেন? তিনি বললেন, আপা, বাঙালি স্টোরে কাজ খুঁজছি। কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না। টাকা-পয়সা সঙ্গে যা এনেছিলাম সব শেষ। গতকাল দেশ থেকে দুই হাজার ডলার সমান টাকা আনিয়েছি। সেটা দিয়েই চলছি এখন। আমি জানতে চাইলাম, থাকছেন কোথায় আপনি? বললেন, সেটাও তো ছিল আরো ঝামেলার। কোথাও কোনো জায়গা পাচ্ছিলাম না থাকার। অবশেষে অমুক মার্কেটের ওপর একটা এপার্টমেন্টে অনেক জন ছেলে মিলে থাকি। এক জনের ছয়শো ডলার দিতে হয়। ছয়শো ডলার শুধু থাকার খরচ এক রুমে দুই জন মিলে। বাংলাদেশের টাকায় $600 CAD হবে 48,600 টাকার মতো। ওনাকে আপাতত যেহেতু দেশ থেকেই টাকা আনতে হচ্ছে তাই হিসাবটা দিলাম। এরপর আছে খাওয়ার খরচ। সেখানেও একজনের জন্য খাওয়ার খরচ এই আক্রার জামানায় কম বললেও $500 CAD অর্থাৎ 40,500 বাংলাদেশি টাকা লাগবে।
এদিকে যেহেতু তিনি asylum seek করেছেন যার মাধ্যমে আবেদন করেছেন সেই বাঙালিকে নাকি তার বেশ মোটা অংকের ডলার পে করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে টাকা-পয়সা ওনার পকেট থেকে ঝড়ের বেগে উড়ে যাচ্ছে। তারপরেও কবে, কখন কীভাবে গতি হবে তাও তো জানা নেই। শুধু উনিই নয়, এমন আরো অনেকেই এদেশে বিভিন্নভাবে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিছুদিন আগে আমি একটা রেডিওর নিউজে শুনেছিলাম, টরন্টোয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে asylum seeker জমা হচ্ছে। গত কিছুদিন ধরে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অনেক সংখ্যক asylum seeker আন্দোলনের নামে রাস্তায় থাকা শুরু করে। তাদের দাবী ছিল তাদেরকে সরকার বাসস্থান দেবেন। অবশেষে আন্দোলনের পর অনেক asylum seeker কে রাজকীয় হোটেলে থাকতে দেওয়া হয়েছে। থাকা-খাওয়ার খরচ দেবেন। পৃথিবীতে এই একটাই দেশ আছে মনে হয় যেখানে যেকোনোভাবে বিভিন্ন কিছু আদায় করে নেওয়া যায়।
আমি এই বাঙালি ভাইকে বললাম, আপনি তো দেশে ফিরতে পারবেন না। তাহলে আপনার বউ, সন্তানদের সঙ্গেও তো আর দেখা হচ্ছে না অনির্দিষ্ট কালের জন্য। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, জি। এমনটাই হবে। সবই মেনে নিতে হবে। এটাই জীবন। আর রিজিকের মালিক আল্লাহ।
আমার বিশ্লেষণ : উনি যেহেতু well educated না সেহেতু ওনাকে সব সময়ই লো গ্রেডের জব খুঁজতে হবে before and after PR.
Asylum seek করলে কতোদিনে সমাধা হয় আমার ঠিক জানা নেই। কাজেই একটা অনির্দিষ্ট দিনের জন্য মানসিক ও আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে থাকতে হবে।এটা হতে পারে 5 বছরের বেশি সময় লাগবে।
জব পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে সে যে ক্লাসেরই জব হোক for sure ক্যাশের জব করতে হবে work permit না পাওয়া পর্যন্ত।
সব কিছুর জন্য অর্থ খরচ করতে হবে আনকাউন্টেড।
অথবা তাদের দেশে ফিরে যেতে হবে।
যাই হোক, জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে গিয়ে যেন জীবন থেকে সবকিছু হারিয়ে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
তবে ঐ ভাইয়ের একটা কথায় আমি ভালো ফিল করেছি। উনি বললেন, আপা, আপনার সঙ্গে বাংলায় কথা বলে অনেকটা শান্তি পেলাম। কোনো কিছু করার নেই। অনেক ভালো লাগল আপনার সঙ্গে কথা বলে।
যদিও আমার কোনো কিছুই ওনার জন্য করতে পারার সুযোগ নেই, তারপরেও সামান্য কিছুক্ষণ কথা বলার জন্য ওনার ভালো লাগার অনুভূতিটা আমাকেও বেশ আপ্লুত করেছে।
পরে বাসায় এসে মনে হয়েছে ইস! কেনো ঐ ভাইটার ফোন নম্বরটা নিলাম না। তিনি কোন বাসাটায় থাকেন সেটাও নির্দিষ্ট করে জানি না। আমি একদিন অনেক কিছু রান্না করে দিয়ে আসতাম। ওখানে থাকেন আরো পাঁচজন। হতে পারে কেউ কেউ ভীনদেশি। সবার জন্যই দিতাম। মাঝে মাঝেই দিতে পারতাম। আমি ইচ্ছে করেই কাউকে কাউকে দিয়ে আসি হতে পারে সেটা রান্না খাবার, আবার বাগানের সবজি বা ঝাল। দিতে গিয়ে এমনও হয়েছে তারা ঘর থেকে বের হতে পারে না ঘুমাচ্ছে এমন কিছু, আমি বারান্দায় রেখে এসেছি ইত্যাদি।
ঐ ভাইটাকে খোঁজার জন্য মাঝে মাঝে যেতে হবে ড্যানফোর্থে। যদি আবার দেখা পেয়ে যাই। তাহলে নিজের কাছে খুব ভালো লাগবে।
আল্লাহ ওনাকে সমুদ্রের মাঝে তরণিকে ঠিকঠাক কিনারায় নেওয়ার তৌফিক দিন।
আল্লাহ আপনাদের সুস্থ রাখুন।

