কাবা শরিফ—পৃথিবীর বুকে মুমিনের পরম শান্তির ঠিকানা। কালো গিলাফে মোড়ানো এই ঘরের দিকে তাকালেই চোখ ভিজে আসে, হৃদয় প্রশান্ত হয়। কিন্তু কাবার এই পবিত্র দেয়ালের মাঝেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু ইতিহাস, যা আমরা অনেকেই জানি না। আমরা কাবার যে একটিমাত্র উঁচু দরজা দেখি, কাবার গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এর ঠিক বিপরীতে একসময় ছিল আরও একটি দরজা, যা আজ চিরতরে বন্ধ।

কী ছিল সেই আদি কাবার রূপ?
কোরআনের বর্ণনামতে, হজরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.) যখন কাবার ভিত্তি তুলছিলেন, তখন এর পরিধি ছিল আজকের চেয়েও বড়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“আর স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবার ভিত্তিভূমি উত্তোলন করছিল…” (সূরা আল-বাকারা: ১২৭)।
সেই আদিলগ্নে কাবার দরজা ছিল দুটি এবং তা ছিল একদম মাটির সমতলে। মানুষ এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করত এবং অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যেত।
কুরাইশদের সংস্কার এবং একটি দরজার বিদায়
রাসূল ﷺ-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগের কথা। মক্কার কুরাইশরা কাবা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। তাদের মাঝে একটি অত্যন্ত কঠিন ও সুন্দর শর্ত ছিল—“কাবার নির্মাণে কেবল পবিত্র ও হালাল উপার্জনই ব্যবহার করা হবে; কোনো সুদ, চুরি বা হারাম সম্পদ নয়।” কিন্তু সেই যুগে হালাল সম্পদের এতটাই অভাব ছিল যে, সম্পূর্ণ ভিত্তির ওপর কাবা নির্মাণের মতো যথেষ্ট হালাল অর্থ তারা জোগাড় করতে পারেনি! ফলে বাধ্য হয়ে তারা কাবাকে ছোট আকারে নির্মাণ করে এবং ‘হাতীম’ (বা হিজর ইসমাঈল) নামের অংশটি কাবার মূল ঘরের বাইরে রেখে দেয়। শুধু তাই নয়, তারা কাবার একটি দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয় এবং অন্য দরজাটি মাটি থেকে বেশ উঁচুতে স্থাপন করে, যাতে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো মানুষদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
নবীজির ﷺ আক্ষেপ ও এক বিস্ময়কর হিকমাহ
মক্কা বিজয়ের পর কাবার এই অসম্পূর্ণতা রাসূল ﷺ-এর হৃদয়কে নাড়া দিত। তিনি চাইলই কাবাকে পুনরায় তার আদি রূপে ফিরিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। কেন জানেন?
উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে এর উত্তর পাওয়া যায়। রাসূল ﷺ তাঁকে বলেছিলেন:
“হে আয়েশা! তোমার কওম (কুরাইশরা) যদি জাহেলিয়াতের যুগের খুব কাছাকাছি না হতো (অর্থাৎ তারা যদি নতুন মুসলিম না হতো), তবে আমি কাবা ভেঙে ইবরাহীম (আ.)-এর ভিত্তির ওপর তা পুনর্নির্মাণ করতাম। এবং এর দুটি দরজা বানাতাম—একটি দিয়ে মানুষ প্রবেশ করত, অন্যটি দিয়ে বের হতো।” (সহীহ বুখারী: ১৫৮৩, সহীহ মুসলিম: ১৩৩৩)।
কী অদ্ভুত সেই প্রজ্ঞা! একটি পবিত্র পাথরের ঘরের কাঠামোর চেয়ে সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী মানুষের হৃদয়ের ঈমান ও আবেগকে নবীজি ﷺ কতটা বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন!

ইতিহাসের উত্থান-পতন
রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের বহু বছর পর, ৬৪ হিজরিতে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) যখন মক্কার শাসনভার গ্রহণ করেন, তিনি রাসূল ﷺ-এর সেই অপূর্ণ ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেন। তিনি কাবাকে ইবরাহীম (আ.)-এর কাঠামো অনুযায়ী নির্মাণ করেন, হাতীমকে ভেতরে নেন এবং দুটি দরজাই মাটির সমতলে উন্মুক্ত করে দেন।
কিন্তু ইতিহাসের চাকা আবারও ঘোরে। ৭৩ হিজরিতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মক্কা আক্রমণ করে এবং তৎকালীন খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে কাবাকে পুনরায় কুরাইশদের তৈরি কাঠামোতে ফিরিয়ে নেয়। বন্ধ হয়ে যায় সেই দ্বিতীয় দরজাটি! পরবর্তীতে খলিফা যখন আসল হাদীসটি জানতে পারেন, তখন তিনি তীব্র আফসোস করে বলেছিলেন, “হায়! যদি আমি ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর নির্মাণটিই রেখে দিতাম!”

ইমাম মালিক (রহ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ফতোয়া
এরপর আব্বাসীয় যুগে খলিফা পুনরায় কাবাকে নবীজির ﷺ ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ ইমাম মালিক (রহ.) তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করে এক ঐতিহাসিক কথা বলেছিলেন:
“হে আমিরুল মুমিনিন! বাইতুল্লাহকে রাজাদের হাতের খেলনায় পরিণত করবেন না। যে আসে সেই যদি কাবা ভাঙে আর গড়ে, তবে মানুষের অন্তর থেকে এই ঘরের প্রতি সম্মান ও গাম্ভীর্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।”
আজকের কাবা…
সেই থেকে আজও কাবা ঠিক সেই অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে আছে। এরপর যত কাজ হয়েছে, সবই কেবল সংস্কার বা সংরক্ষণ। কাবার সেই দ্বিতীয় দরজাটি আজও বন্ধ। বাইরে থেকে হয়তো এটি কেবলই ইটের গাঁথুনি, কিন্তু এই বন্ধ দরজার ভেতরে লুকিয়ে আছে নবীজির ﷺ দীর্ঘশ্বাস, সাহাবীদের আবেগ এবং শত শত বছরের ইতিহাসের এক নীরব হিকমাহ।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বারবার কাবার গিলাফ ছুঁয়ে দেখার এবং কাবার ইতিহাসকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করার তাওফিক দান করুন।
আমিন।
জিলহজ্জ গ্রুপ বাংলাদেশ
আমরা বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত বৈধ হজ লাইসেন্স এবং আইটিএ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ।আপনার বিশ্বস্ত ট্রাভেল এজেন্ট
যোগাযোগঃ ইমু ও হোয়াটসএপ 📲01711165606 ,📲01715595991
▶ ঢাকা অফিসঃ ৫১/১ ভিআইপি টাওয়ার,লেভেল -৫,ভিআইপি রোড,নয়াপল্টন ,ঢাকা।
▶কেরানীগঞ্জ অফিসঃ ২৭১ নং জিলা পরিষদ মার্কেট পূর্ব আগানগর,দক্ষিন কেরানীগঞ্জ,ঢাকা।
আমাদের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক টেলিগ্রাম চ্যানেলে আপনি এড হয়ে নিয়মিত এই রকম আরো মাসলা মাসায়েল জানতে
আমাদের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক হোয়াটসএপ গ্রুপে আপনি এড হয়ে নিয়মিত এই রকম আরো মাসলা মাসায়েল জানতে
সর্বশেষ আপডেটের জন্য, আপনি আমাদের ✅WhatsApp গ্রুপ বা ☑️ টেলিগ্রাম চ্যানেলে যোগ দিতে পারেন।

